দীর্ঘদিন ধরে আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা তিনটি ভিন্ন ধারায় বিভক্ত ছিল—সাধারণ শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা এবং কারিগরি শিক্ষা। এই তিনটি ধারার মধ্যে কোনো শক্তিশালী সেতুবন্ধন ছিল না। ফলে কারিগরি শিক্ষা থেকে আসা একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর জন্য উচ্চশিক্ষার পথ ছিল সীমিত, আবার সাধারণ শিক্ষার একজন স্নাতকের জন্য হাতে-কলমে কাজ শেখার সুযোগ ছিল কম। এই বৈষম্য দূর করতে এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের (যেমন মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ বা অস্ট্রেলিয়া) সাথে আমাদের ডিগ্রির সমতা বিধান করতে সরকার National Technical Vocational Qualifications Framework (NTVQF) এবং পরবর্তীতে একে আরও বিস্তৃত করে BNQF প্রবর্তন করেছে । এটি একটি ১০ স্তরের কাঠামো যা প্রাক-বৃত্তিমূলক পর্যায় থেকে শুরু করে পিএইচডি পর্যন্ত বিস্তৃত ।
১. প্রাথমিক দক্ষতার স্তর (লেভেল ১ – ২): শ্রমবাজারের প্রবেশদ্বার
BNQF-এর শুরুর স্তরগুলো মূলত সেই সব মানুষের জন্য যারা প্রথাগত দীর্ঘমেয়াদী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় যুক্ত হতে পারেননি কিন্তু কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের জন্য ন্যূনতম দক্ষতা প্রয়োজন।
-
লেভেল ১ (National Skill Certificate – NSC 1): এটি প্রাথমিক যোগ্যতার স্তর যা যেকোনো বয়সের মৌলিক দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের জন্য । এটি মূলত এন্ট্রি-লেভেল কাজের জন্য ভিত্তি তৈরি করে । একজন ব্যক্তি যিনি আগে কখনো কোনো প্রশিক্ষণ নেননি, তিনি যদি একটি স্বল্পমেয়াদী কোর্সের মাধ্যমে গার্মেন্টস বা কনস্ট্রাকশন সাইটে সাহায্যকারী হিসেবে কাজ করার ন্যূনতম দক্ষতা অর্জন করেন, তবে তিনি NSC 1 সনদ পাবেন ।
-
লেভেল ২ (NSC 2): এই স্তরে শিক্ষার্থীকে আধা-দক্ষ (Semi-skilled) কর্মী হিসেবে গড়ে তোলা হয় । তারা রুটিনমাফিক কাজগুলো স্বাধীনভাবে করতে পারে । একজন অটোমোবাইল মেকানিকের সহকারী যিনি ইঞ্জিনের সাধারণ ত্রুটি সারাতে পারেন বা রুটিন সার্ভিসিং করতে পারেন, তিনি NSC 2 পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত ।
২. মাধ্যমিক ও কারিগরি দক্ষতার সমন্বয় (লেভেল ৩): দক্ষ শ্রমিকের ভিত্তি
লেভেল ৩ (NSC 3 / SSC): এটি BNQF-এর অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর কারণ এখানে কারিগরি এবং সাধারণ শিক্ষার সরাসরি সমন্বয় ঘটে ।
-
সাধারণ শিক্ষা: এটি মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (SSC) বা দাখিল সমমান ।
-
কারিগরি শিক্ষা: যারা কারিগরি ধারা বা ভোকেশনাল থেকে এসএসসি পাশ করেন, তারা একই সাথে সাধারণ এসএসসি সনদ এবং NSC 3 সনদ লাভ করেন ।
একজন দক্ষ কর্মী (Skilled worker) তৈরি করা যিনি শ্রমবাজারে সরাসরি উৎপাদনশীল ভূমিকা রাখতে পারেন । একজন সার্টিফাইড ইলেকট্রিশিয়ান বা ওয়েল্ডার যিনি ড্রয়িং বুঝে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন, তিনি লেভেল ৩-এর দক্ষতাসম্পন্ন ।
৩. উচ্চতর দক্ষতা ও সুপারভাইজারি স্তর (লেভেল ৪ – ৫): মধ্যম সারির নেতৃত্ব
এই স্তরগুলো থেকে মূলত শিল্প-কারখানার তদারকি বা সুপারভাইজারি পর্যায়ের জনবল তৈরি শুরু হয়।
-
লেভেল ৪ (NSC 4): এটি উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী বা ‘ফুল ক্র্যাফটসম্যানশিপ’-এর স্তর । এখানে কর্মীকে জটিল এবং বিশেষায়িত কাজ করার জন্য প্রস্তুত করা হয় । একজন সিনিয়র গ্রাফিক ডিজাইনার বা জটিল মেশিন অপারেটর যিনি শুধু কাজই করেন না, বরং কাজের গুণগত মানও নিশ্চিত করেন ।
-
লেভেল ৫ (NSC 5 / HSC / Alim): এটি উচ্চ-মাধ্যমিক বা এইচএসসি সমমান । ভোকেশনাল থেকে এইচএসসি করা শিক্ষার্থীরা এখান থেকে ‘ডুয়াল সার্টিফিকেট’ (HSC এবং NSC 5) পান । এই স্তরের গ্র্যাজুয়েটরা সাধারণত শিল্প-কারখানায় সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করার যোগ্যতা অর্জন করেন । তারা নিচের স্তরের কর্মীদের কাজের সমন্বয় করেন ।
৪. ডিপ্লোমা ও উচ্চশিক্ষার সেতুবন্ধন (লেভেল ৬): মিড-লেভেল ম্যানেজমেন্ট
লেভেল ৬ (NSC 6 / Diploma): এটি কারিগরি শিক্ষার এক অনন্য স্তর যা উচ্চশিক্ষার (HE) সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করে । ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং বা সমমানের কোর্সগুলো এই স্তরে পড়ে । এখানে ব্যবহারিক দক্ষতার পাশাপাশি তাত্ত্বিক জ্ঞানের ওপর গভীর জোর দেওয়া হয় । এখান থেকে উত্তীর্ণরা মধ্যম পর্যায়ের ব্যবস্থাপক (Mid-level manager) বা বিশেষায়িত টেকনিশিয়ান হিসেবে কাজ করেন । একজন ডিপ্লোমা ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার যিনি একটি বড় আবাসন প্রকল্পের সাইট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে পুরো কাজের তদারকি এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করেন ।
৫. উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জগত (লেভেল ৭ – ১০): বিশেষজ্ঞ ও উদ্ভাবক তৈরি
BNQF-এর শেষ চারটি স্তর মূলত বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক এবং গবেষণামূলক উচ্চশিক্ষার জন্য নির্ধারিত।
-
লেভেল ৭ (Bachelor’s Degree): এটি ৩ থেকে ৫ বছর মেয়াদী স্নাতক পর্যায় । এটি পেশাদার জীবনের মূল ভিত্তি এবং উচ্চশিক্ষার পরবর্তী ধাপগুলোর প্রবেশদ্বার ।
-
লেভেল ৮ (Postgraduate Certificate/Diploma): এটি স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের মাঝে একটি বিশেষায়িত স্তর । এটি শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে অ্যাডভান্সড নলেজ অর্জনে সহায়তা করে
-
লেভেল ৯ (Master’s Degree): এটি ১ থেকে ২ বছর মেয়াদী স্নাতকোত্তর স্তর । এখানে কোর্সওয়ার্কের পাশাপাশি গবেষণা বা থিসিসের মাধ্যমে উচ্চতর পেশাদার দক্ষতা নিশ্চিত করা হয় ।
-
লেভেল ১০ (Doctoral Degree): এটি BNQF-এর সর্বোচ্চ স্তর । এখানে একজন শিক্ষার্থী তার গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করেন এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেতৃত্বে অবদান রাখেন ।
কেন একজন শিক্ষার্থীর জন্য BNQF জানা জরুরি?
আমি সবসময় বলি, “দক্ষতাই আপনার সবচেয়ে বড় সম্পদ”। BNQF কেন আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তার কিছু পয়েন্ট নিচে তুলে ধরলাম:
১. আজীবন শিক্ষার পথ (Lifelong Learning): এই কাঠামোর ফলে একজন শিক্ষার্থী যদি লেভেল ১ থেকে তার যাত্রা শুরু করেন, তবে তিনি ধীরে ধীরে লেভেল ১০ পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ পাবেন 。 মাঝপথে ঝরে পড়ার কোনো ভয় নেই।
২. কাজের সমতা ও মর্যাদা: আগে কারিগরি শিক্ষা বা মাদ্রাসার ডিগ্রি নিয়ে মূলধারার চাকরিতে অনেক সমস্যা হতো। এখন BNQF লেভেল অনুযায়ী একজন মাদ্রাসার ‘ফাজিল’ ডিগ্রিধারী (লেভেল ৭) এবং একজন সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক (লেভেল ৭) সমান মর্যাদা পাবেন ।
৩. আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা: যখন আপনি বিদেশে কাজের জন্য যাবেন, তখন তারা আপনার লোকাল সার্টিফিকেটের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিবে আপনি কোন ‘লেভেল’-এর গ্র্যাজুয়েট। BNQF আন্তর্জাতিক ফ্রেমওয়ার্কের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় আমাদের সনদগুলো এখন বিদেশে আরও বেশি গ্রহণযোগ্য।
৪. CBT&A পদ্ধতি: এই পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাটি Competency-Based Training and Assessment (CBT&A)-এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি 。 এর মানে হলো, আপনি শুধু বই পড়লেই হবে না, আপনাকে কাজটি বাস্তবে করে দেখাতে হবে। আপনি যদি কোনো কাজে সক্ষম হন, তবেই আপনি পরবর্তী লেভেলে যেতে পারবেন।
আমাদের করণীয়
বাংলাদেশ ন্যাশনাল কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক শুধু একটি নীতিগত দলিল নয়, এটি আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তির পথচিত্র।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই ফ্রেমওয়ার্কের প্রতিটি স্তরকে তৃণমূল পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। যখন একজন সাধারণ শ্রমিক জানবেন যে তার ছোট একটি প্রশিক্ষণের সার্টিফিকেট তাকে লেভেল ১-এর মর্যাদা দিচ্ছে এবং এটি তাকে লেভেল ৩ বা ৪-এ যাওয়ার পথ দেখাচ্ছে, তখনই আমাদের দেশে একটি ‘দক্ষতা বিপ্লব’ ঘটবে।
আসুন, আমরা মুখস্থ বিদ্যার পেছনে না ছুটে দক্ষতা অর্জনের পেছনে ছুটি। BNQF-এর প্রতিটি ধাপ হোক আপনার সাফল্যের এক একটি সিঁড়ি।
ধন্যবাদ।
খান মোহাম্মদ মাহমুদ হাসান
TVET বিশেষজ্ঞ ও গবেষক।

